মানব জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আখিরাতের সফলতা লাভ। ইসলামী দর্শনে অন্তর বা ক্বলবকে শরীরের প্রাণ বলা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“أَلاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ”
“শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীর ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীর খারাপ হয়ে যায়। সে গোশতের টুকরোটি হল অন্তর (ক্বলব)।” —(সহীহ বুখারী: ৫২)
অর্থাৎ, অন্তরের সুস্থতা সমগ্র ব্যক্তিত্বের পবিত্রতার ভিত্তি।
অন্তরে মরিচার থাকলে আত্মশুদ্ধি অসম্ভব
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“إِذَا أَذْنَبَ الْعَبْدُ وَحَلَّ فِي قَلْبِهِ وَسْخٌ، فَلَمَّا تَابَ وَأَسْتَغْفَرَ وَتَرَكَ الذَّنْبَ نَضَفَ قَلْبُهُ”
“মুমিন ব্যক্তি যখন পাপ করে তখন তার অন্তরে কালো দাগ পড়ে; যখন সে তওবা করে ও ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন তার অন্তর পরিচ্ছন্ন হয়।” —(সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৪৪)
আর আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেছেন:
“كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ”
“না, বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়েছে।”—(সূরা মারেয়াম: ১৪)
অতএব অন্তর পরিষ্কার না হলে সফলতা সম্ভব নয়।
সফলতার জন্য আত্মশুদ্ধি ও জিকিরের
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّىٰ وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّىٰ”
“নিশ্চয় সফল হয়েছে সে, যে আত্মশুদ্ধি করেছে এবং তার রবের নামে জিকির করেছে, অতঃপর নামাজ আদায় করেছে।” —(সূরা আ’লা: ১৪-১৫)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“لِكُلِّ شَىْءٍ صِقَالَةٌ وَصِقَالَةُ الْقُلُوبِ ذِكْرُ اللّٰهِ”
“প্রত্যেক বস্তু পরিষ্কারের জন্য মাজন থাকে, আর অন্তরের মাজন হলো আল্লাহর জিকির।”—(মিশকাতুল মাসাবিহ: ২২৮৬)
অতএব আত্মশুদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হলো আল্লাহর নাম স্মরণ করা, অর্থাৎ জিকির।
জিকিরের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
আরবি ভাষায় ‘জিকির’ (ذِكْر) শব্দের অর্থ “স্মরণ”। কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
“فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ”
“তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব।” (সূরা বাকারা: ১৫২)
আরেক স্থানে আল্লাহ বলেন:
“وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ”
“আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হও।”—(সূরা জুমআ: ১০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ”
“সাত প্রকার লোককে আল্লাহ তাঁর ছায়া দিবেন, যার মধ্যে এক ব্যক্তি হলো যিনি আল্লাহর জিকির করে এবং তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়।”—–(বুখারী:660, ৬৪৭৯)
আসিম ইব্ন হুমায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিত:
তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাত্রে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়ার পর কি জিকির করতেন? তিনি বললেন, তুমি আজ আমাকে এমন একটি বিষয়ে প্রশ্ন করেছ, যে বিষয়ে তোমার পূর্বে অন্য কেউ আমাকে প্রশ্ন করেনি। রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দশবার তাকবীর (আল্লাহু আকবার) দশবার তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) দশবার তাসবীহ (সুবাহানাল্লাহ) দশবার তাহলীল (লা-ইলাহা ইলাল্লাহ্) এবং দশবার ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়তেন। (সুনানে আন-নাসায়ী : ১৬১৭)
শয়তান আদম সন্তানের কলবের বা অন্তরের উপর জেঁকে বসে থাকে। যখন সে আল্লাহর জিকির করে তখন সরে যায় আর যখন গাফিল বা অমনোযোগী হয় তখন শয়তান তার দিলে ওয়াস্ওয়াসা দিতে থাকে। (মিশকাতুল মাসাবিহ : ২২৮১)
শ্রেষ্ঠ জিকির
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“أَفْضَلُ الذِّكْرِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَفْضَلُ الدُّعَاءِ الْحَمْدُ لِلَّهِ”
“সবচেয়ে উত্তম জিকির হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং সর্বোত্তম দোয়া হলো ‘আলহামদুলিল্লাহ’। (তিরমিজি: ৩৩৮৩)
এছাড়াও বলা হয়েছে,
“مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ”
“যার শেষ বাক্য ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সুনানে আবু দাউদ: ৩১১৬)
জিকিরের স্থান ও সময়
জিকিরের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে মসজিদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“إِنَّ الْمَسَاجِدَ لَا تَصْلُحُ لِلْبَوْلِ وَلَا النَّجَاسَةِ، إِنَّمَا هِيَ لِذِكْرِ اللَّهِ وَتِلَاوَةِ الْقُرْآنِ”
“মসজিদ পেশাব ও মলমূত্রের স্থান নয়, বরং আল্লাহর জিকির ও কোরআন তেলাওয়াতের স্থান।”–(রিয়াদুস সালিহীন: ১৭০৪)
মসজিদে জিকিরের ব্যাপারে রাসূল (স:) কল্যাণকর বলেছেন। একদিন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কোন এক হুজরা থেকে বের হয়ে এসে মাসজিদে প্রবেশ করেন। তখন সেখানে দু’টি সমাবেশ চলছিল। একটি সমাবেশে লোকজন কুরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহ্র যিকরে মশগুল ছিল এবং অপর সমাবেশে লোকজন শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানে রত ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, সকলেই কল্যাণকর তৎপরতায় রত আছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৯)
রাসূল (সা.) ফজরের নামাজ শেষে মসজিদে বসে জিকির করতে উৎসাহ দিয়েছেন। (তিরমিজি: ৫৮৬)
রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন; আমি এমন একটি দলের সাথে বসবো যারা ফাজ্রের সলাত হতে শুরু করে সূর্য উঠা পর্যন্ত মহান আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকে। এ কাজ আমার নিকট ইসমাঈলের (আঃ)-এর বংশের দাসী আযাদ করার চেয়ে অধিক প্রিয়। (আবু দাউদ: ৩৬৬৭)
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا”
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির কর এবং সকালের ও সন্ধ্যার সময় তাঁকে পবিত্র ঘোষণা কর।” (সূরা আহযাব: ৪১-৪২)
দলগত বা একত্রিত জিকিরের গুরুত্ব
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَا تَوَطَّنَ رَجُلٌ مُسْلِمٌ الْمَسَاجِدَ لِلصَّلاَةِ وَالذِّكْرِ إِلاَّ تَبَشْبَشَ اللَّهُ لَهُ كَمَا يَتَبَشْبَشُ أَهْلُ الْغَائِبِ بِغَائِبِهِمْ إِذَا قَدِمَ عَلَيْهِمْ
“কোন মুসলিম ব্যক্তি যতক্ষণ মসজিদে সালাত ও যিকিরে রত থাকে ততক্ষণ আল্লাহ তাঁর প্রতি এতটা আনন্দিত হন, প্রবাসী ব্যক্তি তাঁর পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে যেরূপ আনন্দিত হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৮০০)
জিকিরের মাজলিসগুলোকে জান্নাতের বাগান বলা হয়েছে। আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: তোমরা যখন জান্নাতের বাগানগুলোর পার্শ্ব দিয়ে যাবে সে সময় সেখান হতে পাকা ফল তুলে নিবে। লোকজন প্রশ্ন করল, জান্নাতের বাগানগুলো কি? তিনি বললেন, যিকিরের মাজলিস। (জামে’ আত-তিরমিজি : ৩৫১০)
একত্রিত হয়ে সামান্য উচ্চস্বরে জিকির করলেও দোষের কিছু নাই। কারণ, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) এর সময় মুসল্লীগন ফরয সালাত শেষ হলে উচ্চঃস্বরে করতেন। (বুখারী: ৮৪১ এবং মুসলিম: ১২০৫)
জিকিরের বিরোধিতা
আল্লাহ বলেন:
“وَيَصُدُّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ”
“শয়তান তোমাদের আল্লাহর জিকির ও নামাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা মায়িদাহ: ৯১)
তিনি আরো বলেন;
আর তার চেয়ে বড় যালেম কে, যে আল্লাহর মাসজিদসমূহে আল্লাহর জিকির করতে বাধা প্রদান করে এবং তা বন্ধ করতে চেষ্টা করে? তাদের তো উচিৎ ছিল ভীত হয়ে তাতে প্রবেশ করা। তাদের জন্য দুনিয়ায় রয়েছে লাঞ্ছনা আর আখিরাতে রয়েছে মহাআযাব। (সুরা বাকারা ২:১১৪)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ”
“যে তার প্রতিপালকের জিকির করে এবং যে করে না, তাদের উপমা হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।” (মিশকাতুল মাসাবিহ: ২২৬৩)
অতএব নিয়মিত জিকির শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি ও অন্তরের সতেজতার পথ।
জিকিরের দ্বারা চিকিৎসা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
اَلَا بِذِكۡرِ اللّٰهِ تَطۡمَئِنُّ الۡقُلُوۡبُ
“জেনে রাখ আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়। (সুরা রাদ 13:২৮
জিকির নিয়মিত করার ফলে উদ্বেগ, হতাশা দূর হয় এবং ঘুমের সমস্যার সমাধান হয়। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে যখন কেউ আল্লাহর জিকির করে তখন শয়তানের দেয়া একটি গিরা খুলে যায়। (সুনানে আবু দাউদ: ১৩০৬)
এছাড়াও যাদের ঘুমের সমস্যা হয়, ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুম আসেনা; আল্লাহর জিকির করলে শয়তানের পক্ষ থেকে ঘুম এসে যাবে। (আদাবুল মুফরাদ : ১২২০)
সর্বপোরি;
আল্লাহর জিকির মানব জীবনের মূল স্তম্ভ। এটি অন্তরকে মরিচা থেকে মুক্ত করে, আত্মাকে পবিত্র ও প্রশান্ত করে, এবং আখিরাতের সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে। অতএব আমাদের প্রতিদিন নিয়মিত আল্লাহর নাম স্মরণ করে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আলোকিত করতে হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“لَنْ يَنْدَمَ أَحَدٌ عَلَى شَيْءٍ مِثْلَ نَدَمِهِ عَلَى يَوْمِ لَمْ يَذْكُرِ اللَّهَ فِيهِ”
“কেউও সেই দিনের জন্য যতটা আফসোস করবে না, যেদিন সে আল্লাহর জিকির করেনি।” (মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১৬৭৪৬)
— মুদাব্বির সিহাব (কুষ্টিয়া)—
